প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে চা-বাগানের মনি মুন্ডা এখন গ্র্যাজুয়েট

 

বাবার সঙ্গে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন থেকে স্নাতক সম্পন্ন করা মনি মুন্ডা

সব বাধা পেরিয়ে চট্টগ্রামের এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন চা-বাগানের মনি মুন্ডা। স্নাতক শেষ করে সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়টির সমাবর্তনে অংশ নিয়েছেন তিনি।

হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার চন্ডিছড়া চা-বাগানের মেয়ে মনি মুন্ডা। তিনি আইডিএলসি-প্রথম আলো ট্রাস্টেরঅদ্বিতীয়াবৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থী। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছানো পরিবারের প্রথম নারী, যাঁরা আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে উচ্চশিক্ষা অর্জন করতে পারছেন না, তাঁদের অনুপ্রাণিত করার জন্য দেওয়া হয় আইডিএলসি-প্রথম আলো ট্রাস্টেরঅদ্বিতীয়াবৃত্তি। ২০২০ সালে এই শিক্ষাবৃত্তি পাওয়া ১০ জনের সবাই মৌলভীবাজার হবিগঞ্জ জেলার চা-শ্রমিকের সন্তান। তাদেরই একজন মনি মুন্ডা।

মনি মুন্ডা বলেন, ‘এই দিনটি শুধু একটি সনদ অর্জনের দিন নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অগণিত পরিশ্রম, নির্ঘুম রাত আর অজস্র কান্না। চা-বাগান থেকে আজকের এই জায়গায় পৌঁছানোর পেছনে বাবা-মায়ের অক্লান্ত শ্রম ত্যাগ জড়িয়ে আছে। বাবা-মায়ের স্বপ্ন পূরণের পথে আজ আমি প্রথম ধাপটি সম্পন্ন করতে পেরেছি। এই দিনটিতে মাকে ভীষণ মনে পড়ছিল-যিনি আমার জন্য কত রাত বাড়ির বাইরে অপেক্ষা করে থেকেছেন, যখন আমি রাতে অনলাইন ক্লাস করতাম। আজ তিনি পাশে থাকলে নিশ্চয়ই সবচেয়ে বেশি খুশি হতেন।

যোগ করে তিনি আরো বলেন, ‘আমার মতো প্রত্যন্ত অঞ্চলের মেয়েদের জন্য এমন একটি সুবর্ণ সুযোগ করে দেওয়ার জন্য এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন, আইডিএলসি প্রথম আলো ট্রাস্টকে জানাই অসংখ্য ধন্যবাদ।

প্রসঙ্গত, গত শনিবার (১০ জানুয়ারি) এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের (এইউডব্লিউ) ১২ তম সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানটি চট্টগ্রাম নগরের র‍্যাডিসন ব্লু চট্টগ্রাম বে ভিউর মেজবান হলে অনুষ্ঠিত হয়। এতে ২৫৩ জন শিক্ষার্থীকে সনদ দেওয়া হয়। সনদপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের একজন হলেন মনি মুন্ডা।

আদিবাসী নেতা রবীন্দ্রনাথ সরেনের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী আজ

 


জাতীয় আদিবাসী পরিষদের প্রয়াত সভাপতি রবীন্দ্রনাথ সরেনের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ২০২৪ সালের ১৩ জানুয়ারি দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার বারকোনা গ্রামে নিজ বাসভবনে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৫ বছর।

আজ প্রয়াণের দুই বছর পূর্তিতে রবীন্দ্রনাথ সরেনের বন্ধু-স্বজন অধিকারকর্মীরা তাকে শ্রদ্ধাভরে স্বরণ করছেন। মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে মঙ্গলবার দিনাজপুর প্রেসক্লাবে স্বরণ সভার আয়োজন করেছে জাতীয় আদিবাসী পরিষদ।

আদিবাসী অধিকারকর্মী হিরন চাকমা ফেইসবুকে লিখেছেন, ‘আদিবাসী, কৃষক ও মেহনতি মানুষের নেতা রবীন্দ্রনাথ সরেন এর দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর স্মৃতির প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা। শোষিত ও বঞ্চিত মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে তাঁর ত্যাগ এবং নেতৃত্ব আমাদের কাছে সর্বদা অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।’  

রবীন্দ্রনাথ সরেন কৃষিকাজের পাশাপাশি আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর অধিকার আদায়ের আন্দোলন সংগ্রামে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন। তিনি বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা ছিলেন। তিনি ১৯৯০ সালে নওগাঁর আঘোর নিয়ামতপুরে প্রথম সিধু-কানু চাঁদ ভৈরব স্মৃতিসংঘ প্রতিষ্ঠা করেন এবং এই অঞ্চলের আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর সংগ্রামগাঁথা তুলে ধরেন। ১৯৯৬ সালে নওগাঁর মহাদেবপুরের নাটশালে তিনিই প্রথম কারাম উৎসব শুরু করেন, যা পরবর্তী সময়ে সব আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী অধ্যুষিত এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।

অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে ১৯৯৩ সালে তিনি জাতীয় আদিবাসী পরিষদ গঠন করেন। তিনি দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার তেভাগা চত্বরে সিধু–কানুর ম্যুরাল নির্মাণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ২০০১ সালে আলফ্রেড সরেন হত্যার প্রতিবাদে তিনি আন্দোলন করেছিলেন। ফুলবাড়ি কয়লা খনিবিরোধী আন্দোলনে তিনি ভূমিকা রাখেন। আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর ভূমির অধিকার ও স্বাধীন ভূমি কমিশন গঠনে তিনি আমৃত্যু সংগ্রাম করেছেন।

প্রার্থিতা ফিরে পেলেন খাগড়াছড়ির দুই আদিবাসী প্রার্থী

 


নির্বাচন কমিশনে (ইসি) আপিল করে প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন খাগড়াছড়ি-২৯৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী সোনা রতন চাকমা গণঅধিকার পরিষদের মনোনীত প্রার্থী দীনময় রোয়াজা। সোমবার দুপুরে বিষয়টি গণমাধ্যমকে দুই প্রার্থী নিশ্চিত করেছেন।

স্বতন্ত্র প্রার্থী সোনা রতন চাকমা জানান, ‘এক শতাংশ ভোটারের সমর্থন তালিকায় কয়েকজন ভোটারের নম্বর অসম্পূর্ণ থাকায় জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে আমার মনোনয়নপত্র বাতিল করেন। পরে তিনি নির্বাচন কমিশনে আপিল করলে কমিশন আমার মনোনয়নপত্রকে বৈধ ঘোষণা করে। শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর নেওয়া খুব কঠিন কাজ। সামান্য ভুলের জন্য নির্বাচন কমিশন আসা অত্যন্ত ভোগান্তির। সময় সামান্য ক্রুটি জেলা নির্বাচন অফিস সমাধান করতে পারে। এটার জন্য ঢাকা পর্যন্ত আসা কষ্টদায়ক। শতাংশ ভোাটারের স্বাক্ষর নেওয়ার বিধান বাতিল করা উচিত বলে মনে করি।

গণঅধিকার পরিষদের মনোনীত প্রার্থী দীনময় রোয়াজা বলেন, ‘আমার ব্যাংকে ক্রেডিট কার্ড সংক্রান্ত খুব ছোট্ট একটা সমস্যা ছিল। সেটার জন্য আমাকে আপিল করতে হয়েছে। প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস আমি জমা দিয়েছি। ইসি আমার মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করেছে।

গত জানুয়ারি শনিবার মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষে খাগড়াছড়ি জেলায় মোট ১৫ জন প্রার্থীর মধ্যে জনের মনোনয়ন বাতিলের সিদ্ধান্ত জানানো হয়। এদের মধ্যে তিনজন প্রার্থী নির্বাচন কমিশনে আপিল করেন।

বাতিল হওয়া বাকি সাত প্রার্থী হলেনবাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মাওলানা আনোয়ার হোসাইন মিয়াজী, গণঅধিকার পরিষদের দীনময় রোয়াজা, বাংলাদেশ মুসলিম লীগের মো. মোস্তাফা এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী সন্তোষিত চাকমা, লাব্রিচাই মারমা জিরুনা ত্রিপুরা।

জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, স্বতন্ত্র তিন প্রার্থীর ক্ষেত্রে এক শতাংশ সমর্থক না থাকায় এবং অন্যদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের ঘাটতির কারণে তাদের মনোনয়ন বাতিল করা হয়।

নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের ফলে খাগড়াছড়ি-২৯৮ আসনের নির্বাচনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও জমে উঠবে বলে মনে করছেন ভোটাররা।

খাগড়াছড়ি-২৯৮ আসনে বিএনপির প্রার্থী আবদুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া, জামায়াতে ইসলামীর মো. এয়াকুব আলী, জাতীয় পার্টির মিথিলা রোয়াজা, ইসলামী আন্দোলনের মো. কাউসার, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের মো. নুর ইসলাম, স্বতন্ত্র প্রার্থী ধর্ম জ্যোতি চাকমা এবং বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টির উশোপ্রু মারমার পাশাপাশি মনোনয়ন বৈধ হওয়া দুই প্রার্থীও নির্বাচনী লড়াইয়ে সামিল হবেন।  

জাতীয় আদিবাসী পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অনিল মারান্ডির মৃত্যুবার্ষিকী আজ

 


সমতলের আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর বৃহত্তর সংগঠন জাতীয় আদিবাসী পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অনিল মারান্ডির সপ্তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ২০১৯ সালের জানুয়ারি সোমবার রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার পাঁচগাছিয়া গ্রামের নিজ বাড়িতে অসুস্থতাজনিত কারণে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুবার্ষিকীতে বিভিন্ন আদিবাসী সংগঠন তাকে শ্রদ্ধাভরে স্বরণ করছে।

অনিল মারান্ডি ছিলেন গণমানুষের নেতা। তিনি শোষিত নিপীড়িত মানুষকে একতাবদ্ধ করে সংগ্রামের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। রাজনৈতিক জীবনে তিনি গাইবান্ধার সাঁওতালপল্লিতে হামলার পর নিপীড়িত মানুষের সঙ্গে রাত কাটিয়েছেন। দারিদ্র্যের মধ্যে জীবন অতিবাহিত করার পরও তিনি সংগ্রামআন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। আদিবাসী পরিচয়হীনতা প্রতিনিয়ত তাঁকে পীড়িত করত।

বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, আদিবাসীদের জমি রক্ষার জন্য অনিল মারান্ডি সংগ্রাম শুরু করেন। প্রথম জীবনে তাঁর সাহসী ভূমিকার জন্য সন্ত্রাসীদের হাত থেকে রক্ষা পায় রাজশাহীর বাবুডাইং গ্রাম। তিনি শোষিত ও নিপীড়িত মানুষকে একতাবদ্ধ করে সংগ্রামের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি কমিশনের আদলে সমতলেও আদিবাসীদের ভূমি কমিশন হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন এই আদিবাসী নেতা।

অনিল মারান্ডি সম্পর্কে লেখক ও গবেষক পাভেল পার্থ এক লেখায় জানিয়েছেন, তিনি ছিলেন একজন মেধাবী বিশ্লেষক। খুব সহজে যেকোনো বিষয়ের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ দাঁড় করাতে পারতেন। তবে এই বিশ্লেষণ তিনি করতেন আদিবাসী জগতের প্রান্তিকতার চশমা দিয়ে। এই বিশ্লেষণে আহাজারি যেমন থাকত, থাকত তেমনি দ্রোহের ঝাঁজ। যেকোনো একটি বিষয়ে কিছু সময় আলাপ করলেই তিনি বিষয়টি সামগ্রিকতার পরিধিতে ফেলে আলাপ জমাতে পারতেন। 

১৯৫৬ সালের ১১ অক্টোবর অনিল মারান্ডির জন্ম। ২০১৯ সালে মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৫ বছর। তিনি ১৯৯৩ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত জাতীয় আদিবাসী পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি এবং পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় কমিটির প্রেসিডিয়াম সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

© all rights reserved - Janajatir Kantho