আদিবাসী ও নারী—দুই পরিচয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট সাঁওতাল নারীরা

 


আদিবাসী পরিচয়ের কারণে জাতিগত বঞ্চনা এবং নারী হওয়ার কারণে লিঙ্গবৈষম্যএই দ্বৈত চাপের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে সংগ্রাম করে আসছেন সাঁওতাল নারীরা। এইদ্বৈত বৈষম্য’-এর অবসান দাবি করেছেন তারা। 

আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে রোববার ( মার্চ) সকালে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার কাটাবাড়ী ইউনিয়নে সাঁওতাল নারীরা একটি বর্ণাঢ্য র‍্যালি আলোচনা সভার আয়োজন করেন। সেখানে তারা সমঅধিকার বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের জোরালো দাবি জানান।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাঅবলম্বন’-এর উদ্যোগে এবং মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন আমরাই পারিজোটের সহযোগিতায় কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। এতে সাঁওতাল নারীরা তাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাকে সজ্জিত হয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন।

সকাল ১১টায় কাটাবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদ চত্বর থেকে র‍্যালিটি শুরু হয়ে ঢাকাদিনাজপুর মহাসড়ক পদক্ষিণ করে। র‍্যালিতে অংশগ্রহণকারী নারীদের হাতে থাকা বিভিন্ন প্ল্যাকার্ডে মজুরি বৈষম্য দূর করা এবং ভূমির অধিকার নিশ্চিত করার জোরালো দাবি তুলে ধরা হয়।

র‌্যালি শেষে ইউনিয়ন পরিষদের মিলনায়তনে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন পল্লবী মুর্মু। এতে বক্তব্য দেন অবলম্বনের নির্বাহী পরিচালক প্রবীর চক্রবর্তী, কাটাবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আব্দুল কাইয়ুম, কাটাবাড়ী নাগরিক কমিটির সভাপতি গৌড় চন্দ্র পাহাড়ি, ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য সান্জুয়ারা বেগম।

এ ছাড়া বক্তব্য দেন আদিবাসী যুব নেত্রী সোনালী মার্ডি, আলবীনা মুর্মু, সাধনা রানী, সরস্বতী পাহাড়ি, রুমী পাহাড়ি, তারামনী টপ্য, শিল্পী ওরাও, আবিনা টপ্য, মেরিনা মুর্মুসহ স্থানীয় নারীনেত্রীরা।

সভায় বক্তারা বলেন, সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই সৃজনশীল ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে পুরুষের পাশাপাশি নারীর গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। তবে বাস্তবতায় অনেক ক্ষেত্রেই নারীরা এখনও বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। আদিবাসী নারীদের ক্ষেত্রে এই বৈষম্য আরও প্রকট। তারা নারী হওয়ার কারণে যেমন বৈষম্যের মুখে পড়েন, তেমনি আদিবাসী পরিচয়ের কারণেও নানা বঞ্চনার শিকার হন।

বক্তারা বলেন, বিভিন্ন সময় আদিবাসী নারীরা সহিংসতা, ধর্ষণ, নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন। পাশাপাশি তাদের অনেককে নিজস্ব ভূমি থেকেও উচ্ছেদ হতে হচ্ছে। কৃষি শ্রমবাজারেও আদিবাসী ও বাঙালি নারী শ্রমিকরা পুরুষদের তুলনায় কম মজুরি পান, যা একটি দীর্ঘদিনের বৈষম্য।

তারা আরও বলেন, মানবাধিকার সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। জাতি, ধর্ম, বর্ণ কিংবা লিঙ্গভেদে বৈষম্য করা মানবাধিকারের পরিপন্থি। এই বৈষম্য দূর করতে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

আলোচনা সভায় বক্তারা আদিবাসী নারীদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা ও ভূমির অধিকার নিশ্চিত করার জন্য সরকারের বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানান। 

ঈদের আগে সমাধান না হলে মধুপুর ইস্যুতে ঢাকায় বৃহৎ কর্মসূচির হুশিয়ারি

 


ঈদের আগে মধুপুরের চলমান সমস্যার দ্রুত সমাধানের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় আদিবাসী নেতৃবৃন্দ ও সংশ্লিষ্টরা। তারা সতর্ক করে বলেছেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দৃশ্যমান কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে ঢাকায় জাতীয় পর্যায়ে বৃহত্তর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।

শুক্রবার (৬ মার্চ) সকাল ১০টায় টাঙ্গাইল মধুপুরের আমলীতলা স্কুল মাঠে আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশে বক্তারা এসব কথা বলেন। প্রাকৃতিক শালবন ও প্রাণবৈচিত্র্য ধ্বংস করে কৃত্রিম লেক খনন, কথিত উন্নয়ন প্রকল্পের নামে আদিবাসীদের প্রথাগত নিজভূমি থেকে উচ্ছেদ ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদ জানিয়ে সম্মিলিত আদিবাসী ছাত্র জনতা এ কর্মসূচির আয়োজন করে।

গারো স্টুডেন্ট ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক লিয়াং রিছিলের সঞ্চালনায় সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরামের সাবেক সভাপতি আন্তনী রেমা। এতে বক্তব্য রাখেন জয়েনশাহী আদিবাসী উন্নয়ন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক জন জেত্রা, বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরামের সভাপতি টনি চিরান, গারো স্টুডেন্ট ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি প্রলয় নকরেক, আবিমা গারো ইয়ুথ এসোসিয়েশনের মহাসচিব সত্যজিৎ নকরেক, পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের সভাপতি কনেজ চাকমা, আবিমার নারী নেত্রী অপর্না দফো প্রমুখ।

সমাবেশে বক্তারা বলেন, প্রাকৃতিক শালবনের পরিবেশ, প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য নষ্ট করে সেখানে কৃত্রিম লেক খনন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এমন উদ্যোগ শুধু শালবনের ওপরই নয়, বরং বনাঞ্চলে বসবাসকারী আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনধারা ও সংস্কৃতির প্রতিও বড় ধরনের অবিচার হবে। তারা বলেন, শালবন তার স্বাভাবিক ও প্রাচীন রূপেই টিকে থাকুক এবং নিজস্ব মহিমায় সংরক্ষিত থাকুক।

বক্তারা আরও উল্লেখ করেন, বনবাসী মানুষ তাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজন মেটাতে বন থেকে বিভিন্ন ধরনের বনআলু, লতাগুল্ম ও ঔষধি উদ্ভিদ সংগ্রহ করতেন। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এসব প্রাকৃতিক সম্পদ ও ঐতিহ্যবাহী জীবনধারা ধীরে ধীরে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন প্রকল্পের মধ্য দিয়ে লেক খনন, বিনোদনকেন্দ্র, হোটেল, রিসোর্ট নির্মাণের মধ্য দিয়ে অবশিষ্ট যেটুকু বন আছে তা নষ্ট করে স্থানীয় গারো কোচ আদিবাসীদের উচ্চেদের পায়তারা চলছে।

সমাবেশ থেকে আদিবাসীদের ভূমিতে লেক খনন ও আদিবাসীদের স্বার্থ বিরোধী সকল উন্নয়ন প্রকল্প বন্ধ, সমতল আদিবাসীদের ভূমি সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য পৃথক মন্ত্রনালয় ও ভূমি কমিশন গঠন, আদিবাসীদের প্রথাগত ভূমি অধিকারের স্বীকৃতি, সকল আদিবাসী হত্যাকান্ডের বিচার নিশ্চিত করা ও মধুপুরে আদিবাসীদের নামে সকল মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করার দাবি জানানো হয়।

© all rights reserved - Janajatir Kantho